- by Editor
- Jan, 02, 2025 18:05
নিজস্ব প্রতিবেদক: খুলনার তেরখাদা থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সরদার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠলেও, তিনি এখনও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন খুলনা জেলার পুলিশের অপরাধ তদন্ত শাখায়।চাঁদাবাজি, হয়রানি,রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা,এমনকি ধর্ষণ মামলা ধামাচাপার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে ।তবুও প্রশাসনের নীরবতা অব্যাহত। প্রশ্ন উঠছে,এতোসব অভিযোগ সত্ত্বেও কি কারণে বহাল থাকছেন তিনি?
বিচারের বদলে প্রভাবশালীর ছায়া:
সম্প্রতি তেরখাদা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ওসি মোশাররফসহ ১০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় পুরনো সব অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে।বাদী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো.গোলাম মোস্তফা ভুট্টো জানিয়েছেন, “সেই সময় প্রতিবাদ করার পরিবেশ ছিল না। এখন সাহস করে আইনের আশ্রয় নিয়েছি।” মামলায় উঠে এসেছে ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদা আদায় ও ক্রসফায়ারের হুমকির মতো ভয়াবহ অভিযোগ।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, নাকি ব্যক্তিগত স্বার্থে হয়রানি?
উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক চৌধুরী ফখরুল ইসলাম বুলু জানিয়েছেন,তার প্রয়াত পিতাকে ২০২৪ সালের একটি নাশকতা মামলায় আসামি করা হয়েছে—যিনি মারা গেছেন ২০১২ সালে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন তোলে। শুধু তিনি নন,উপজেলার বিভিন্ন ভুক্তভোগী ওসির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।উপজেলার ভুক্তভোগী পশ্চিম কাটিঙ্গা এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, কোনো ওয়ারেন্ট বা অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও ওসি মোশাররফ তাকে আটক করে টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো হয়। কয়েক মাস জেলে থাকার পরও বিচার পাননি। একই এলাকার তাজ মাহমুদ অভিযোগ করে বলেন,ওসি মোশাররফ তিনটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করেন এবং থানায় আটকে রেখে মানসিকভাবে হয়রানি করেন।কাটেঙ্গা এলাকার সিঙ্গাপুর প্রবাসী সবুজ খান বলেন, জমি-সংক্রান্ত বিষয়ে ওসি মোশাররফ তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ না করে বরং নানা ভাবে হয়রানি করেন।”অন্যদিকে,শেখপুরা এলাকার বাসিন্দা বিএনপি নেতা জাহিদুর রহমান অভিযোগ তুলেছেন ওসির বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, “ওসি আমাকে একাধিকবার ভয়-ভীতি দেখিয়ে টাকা নিয়েছেন। কিন্তু তারপরও আমাকে মিথ্যা নাশকতা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার।”
ধর্ষণ মামলায় গড়িমসি, ছাত্র জনতার রোষ:
উপজেলার বলর্ধনা এলাকার বাকপ্রতিবন্ধী গৃহবধূর ধর্ষণের ঘটনায় ওসি মোশাররফের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন,অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও তিনি মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং অর্থের বিনিময়ে অপরাধীদের রক্ষা করেন। শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনের চাপে মামলা নিলেও, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে কোনো পদক্ষেপ ছিল না। অবশেষে প্রশাসন তাকে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করে।পুরস্কারপ্রাপ্ত ওসি,নাকি ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতীক?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,তেরখাদা ছাড়াও রূপসা ও লবণচরায় দায়িত্ব পালনকালে মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। তবুও তিনি একাধিকবার “শ্রেষ্ঠ ওসি” হিসেবে পুরস্কৃত হন। স্থানীয়দের প্রশ্ন,প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া কি তাকে রক্ষা করে চলেছে?
প্রশাসনের নিরবতা নিয়ে প্রশ্ন:
স্থানীয়দের ভাষায়,তেরখাদা থানাটি একসময় ‘চাঁদাবাজির আখড়া’ হয়ে উঠেছিল। সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় ছিল রুটিন। অথচ এসব অভিযোগ উপেক্ষা করে মোশাররফ এখনও সরকারি দায়িত্বে রয়েছেন। প্রশাসনের নিরবতা এখন জনমনে প্রশ্ন তুলেছে—“আইনের শাসন কি শুধুই কথার কথা?”
তদন্ত কি ফলপ্রসূ হবে?
বর্তমানে মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কিন্তু পূর্বের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা এমন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সত্যিকার বিচার আদায় সহজ নয়। স্থানীয়দের আশা,এবার যেন অন্য রকম হয়। এলাকাবাসীর দাবি,একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন একই ধরনের অসংখ্য অভিযোগ উঠে আসে, তখন তা নিছক ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়—বরং তা একটি অন্ধকার বাস্তবতার প্রতিফলন। প্রশাসনের উচিত, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে জনগণের বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করা।