আজকের তারিখ: শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১৩ রাত | ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলনার দৌলতপুরে আলোচিত জোড়া হত্যা মামলায় ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড


নিজস্ব প্রতিবেদক, দীর্ঘ ১৬ বছর পর অবশেষে পরিণতি পেল খুলনার দৌলতপুরের বহুল আলোচিত জোড়া হত্যা মামলা। আদালত এ মামলার সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দিয়েছেন। মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর ২০২৫) খুলনার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক সুমি আহমেদ এ রায় ঘোষণা করেন।

রায় ঘোষণার সময় কারাগারে থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারী শুভেন্দু রায় চৌধুরী

২০০৯ সালের ৩ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে দৌলতপুরের দিয়ানা সবুজ সংঘ মাঠের পাশে ঘটে এ নৃশংস ঘটনা। স্থানীয় যুবক পারভেজ হাওলাদারকে পরিকল্পিতভাবে ঘেরাও করে সন্ত্রাসীরা প্রথমে গুলি করে এবং পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।

গুলির শব্দ শুনে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে ছুটে আসলে হামলাকারীরা তাদের দিকেও গুলি চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হন সুপর্ণা সাহাসহ কয়েকজন পথচারী। পরে আহতদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সুপর্ণা সাহা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এই ঘটনায় নিহত পারভেজ হাওলাদারের বাবা নিজাম উদ্দিন পরদিন (৪ জানুয়ারি ২০০৯) দৌলতপুর থানায় সাতজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

তদন্তের দায়িত্ব পায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) দৌলতপুর থানা।
দীর্ঘ তদন্তে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা মামলার চার্জশিটে ৭ জনের নাম উল্লেখ করেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলা ছিল।

চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন:
১️⃣ আবদুল কাদের
২️⃣ রফিকুল ইসলাম
৩️⃣ জাহাঙ্গীর হোসেন
৪️⃣ সোহেল শেখ
৫️⃣ আলমগীর হোসেন
৬️⃣ নূর ইসলাম
৭️⃣ রুবেল হোসেন

(উল্লেখ্য: নামগুলো রায়ের সরকারি নথি অনুযায়ী; কয়েকজন পলাতক থাকলেও পরে গ্রেফতার হয়।)

মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (খুন), ৩৪ ধারা (অভিন্ন উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ অপরাধ) এবং ১৮৬৫ সালের অস্ত্র আইন অনুযায়ী বিচারাধীন ছিল।

রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন,“আসামিরা পরিকল্পিতভাবে ভিকটিমকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়, যা সমাজে চরম নিরাপত্তাহীনতার বার্তা দেয়। সাক্ষ্য, ফরেনসিক প্রতিবেদন ও অস্ত্র উদ্ধার–সব মিলিয়ে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে নিঃসন্দেহে।”

  • মামলায় মোট ২১ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন।
  • ঘটনাস্থল থেকে গুলি খোসা, রক্তমাখা ছুরি ও কাপড় উদ্ধার করা হয়, যা ডিএনএ পরীক্ষায় ভিকটিমের রক্তের সঙ্গে মিলে যায়।
  • ঘটনার সময় এলাকাবাসীর কয়েকটি চোখে দেখা সাক্ষ্য (eye-witness) আদালতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে চলা এই মামলার রায়ে ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আদালত বলেন, “এই রায় হবে ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত।”

রায় ঘোষণার পর নিহত পারভেজ হাওলাদার ও সুপর্ণা সাহার পরিবার আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন,“আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। অনেক বছর অপেক্ষার পর আজ মনে হচ্ছে, তাদের আত্মা শান্তি পাবে।”

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন।

২০০৯ সালের দৌলতপুরের এই জোড়া হত্যা ছিল খুলনা মহানগরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে অবশেষে ন্যায়বিচারের এই রায় বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় করবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

author

Editor

খুলনার দৌলতপুরে আলোচিত জোড়া হত্যা মামলায় ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

Please Login to comment in the post!
adds

you may also like